রাত্রির শেষ প্রহরে যখন চাঁদটা আকাশের নীল মখমলে একটি রুপালি সেজদার মতো ঝুঁকে পড়ে, তখন আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই। আয়নায় আমাকে দেখা যায় না, দেখা যায় একটি মাটির দেয়াল, যা ক্রমশ ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ছে। আজ এক মুসাফিরের শেষ গোসলের দাওয়াত এসেছে।
আপনি কি কখনো কোনো মৃতদেহকে গোসল করিয়েছেন? যদি না করিয়ে থাকেন, তবে জেনে রাখুন—আপনি এখনো জীবনের প্রধান পাঠ্যবইটি খোলেননি।
শীতলতার ইশতেহার
সেই ঘরটিতে যখন ঢুকলাম, দেখলাম বাতাস থমকে আছে। মনে হচ্ছিল, সময় নিজেই সেখানে ইন্তেকাল করেছে। স্ট্রেচারের ওপর শুয়ে থাকা মানুষটি গতকালও হয়তো শহরের রাজপথে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাঁর আঙুলের ইশারায় হয়তো ফাইল নড়ত, তাঁর কণ্ঠস্বরে কাঁপত অধীনস্থের বুক। অথচ আজ? আজ তিনি একতাল কাদা মাটির চেয়েও বেশি নিঃসহায়।
আমি যখন তাঁর শীতল শরীরে প্রথমবার হাত রাখলাম, আমার আঙুলগুলো যেন এক গহন অরণ্যের হিমবাহে গিয়ে ঠেকল। একি আশ্চর্য বিমূর্ততা! যে দেহকে ঘিরে একদা সুগন্ধির উৎসব হতো, আজ তা এক অদ্ভুত ভীতির আধার। মৃতদেহ বড় একা, বড় বেশি পরকীয়। তাঁর চোখ দুটো বুজে আছে সত্য, কিন্তু সে বন্ধ চোখের ভেতর যেন অনন্তকালের এক মহাকাশ লুকিয়ে আছে—যেখানে নক্ষত্ররা নিভে গেছে অনেক আগেই।
বিভীষিকার আয়না
রাতের গভীরে সেই লাশের পাশে একা বসে থাকার অভিজ্ঞতা কি আপনার আছে? লণ্ঠনের আলো যখন দেয়ালে লাশের ছায়াটাকে দীর্ঘ করে তোলে, তখন মনে হয়—ছায়াটি বুঝি আসমান ছুঁতে চাইছে। যাকে আপনি আজীবন 'প্রাণপ্রিয়' বলে ডাকলেন, যাঁর বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতেন, সেই মানুষটির নিস্পন্দ দেহ মধ্যরাতে আপনার ভেতরে এক আদিম আতঙ্কের জন্ম দেয় কেন?
কারণ, মৃত্যু মানুষকে 'বস্তু' বানিয়ে দেয়। রুহ যখন খাঁচা ছেড়ে চলে যায়, তখন পড়ে থাকে কেবল একখণ্ড জৈবিক খতিয়ান। আপনি তাকিয়ে দেখবেন, আর ভাববেন—এই কি সেই মানুষ? যাঁর হাসিতে ঘর আলোকিত হতো, আজ তাঁর নির্জীবতায় ঘর কেন এত অন্ধকার? এটিই 'ফানা'র প্রথম সবক। অহংকারের তাজমহলগুলো তখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
শেষ দেখার গোধূলি
কবরের কিনারে যখন আমরা দাঁড়াই, তখন আকাশটা যেন এক বিশাল শোকাতুর হৃদয়ের মতো ফেটে পড়তে চায়। আপনি যখন আপনার অতি আপনজনের লাশ কবরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নামিয়ে দেন, তখন কি তাঁর মুখটি শেষবারের মতো খুব কাছে নিয়ে দেখেন?
দেখবেন, সেই মুখাবয়বে আর কোনো পার্থিব অভিযোগ নেই, নেই কোনো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব। বারবার মনে করার চেষ্টা করবেন—এই মুখটি আর কোনোদিন সূর্যের আলোতে উদ্ভাসিত হবে না। আপনি কোটিবার চিৎকার করলেও সে আর ফিরে তাকাবে না। যে একবার কুদরতের 'তাজাল্লি'র দিকে রওনা দেয়, এই নশ্বর পৃথিবীর ধূলিকণা তাকে আর ফেরাতে পারে না। আমরা আসলে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে মাটির সাথেই যুদ্ধ করি, অথচ দিনশেষে মাটিই হয় আমাদের চিরস্থায়ী আলিঙ্গন।
কবরের স্তব্ধ সংলাপ
মাঝেমধ্যে শহরের কোলাহল ছেড়ে নির্জন গোরস্তানে গিয়ে দাঁড়াবেন। সেখানে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো যেন একেকটি বিদেহী আত্মার দীর্ঘশ্বাস। ভাবুন তো, এই যে মাটির নিচের অন্ধকার গহ্বর—সেখানে এখন কী হচ্ছে?
যাঁরা এখানে শুয়ে আছেন, তাঁরা তো একদিন আমাদের মতোই ইহকালকে আগে আর পরকালকে পরে রেখেছিলেন। তাঁরাও হয়তো ভেবেছিলেন, ব্যাংক ব্যালেন্সের পাহাড় দিয়ে আজরাইলের তরবারি ঠেকিয়ে দেবেন। অথচ আজ তাঁদের উত্তরাধিকারীরা হয়তো মিরাস বণ্টন নিয়ে লিপ্ত হয়েছে কুৎসিত বিবাদে। যাঁদের জন্য তাঁরা সারাজীবন হারাম-হালালের তোয়াক্কা করেননি, সেই প্রিয়জনরা কি একবারও কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফাতেহা পড়ার ফুরসত পায়?
রক্তের প্রতিটি কণা আমাদের শরীরে এক একটি প্রদীপের মতো জ্বলে। কিন্তু সেই রক্ত যখন দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তার কোনো মূল্য থাকে কি? প্রাণের স্পন্দনহীন এই শরীর তখন পচনের ভয়ে দ্রুত সরিয়ে ফেলার বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। আহা! এই নশ্বর হাড়-মাংসের খাঁচা নিয়ে আমাদের কতই না দম্ভ!
মরীচিকার মায়াজাল
আমাদের জীবনটা যেন এক অদ্ভুত সরাইখানা। এখানে আমরা ছেলের মায়ায় অন্ধ, মেয়ের ভালোবাসায় বিভোর। অথচ মৃত্যুর সংবাদ শোনামাত্রই সেই 'মায়াবীরাই' ব্যস্ত হয়ে পড়ে—কত দ্রুত লাশটাকে মাটির নিচে চাপা দেওয়া যায়। কত তাড়াতাড়ি এই আপদ বিদায় করা যায়!
আমরা চল্লিশ, পঞ্চাশ বা সত্তর বছরের এই বুদবুদ সদৃশ জীবনটাকে অনন্ত ভেবে বসি। রমজান আসে, যায়; কিন্তু আমাদের অন্তরের কলুষতা মোচন হয় না। মসজিদের কাতারে কপাল ঘষছি ঠিকই, কিন্তু সুযোগ পেলেই অন্যকে ঠকানোর জন্য আমাদের নফস তলোয়ার উঁচিয়ে বসে থাকে। আমাদের ঈমান আজ কাগজের নৌকার মতো—সামান্য লোভের ঢেউয়েই যা ডুবে যায়।
পরম প্রাপ্তির হিকমত
যদি আমরা জানতাম, কবরের প্রথম রাতে ফেরেশতাদের সওয়াল-জওয়াব কতটা তীক্ষ্ণ হবে, তবে কি আমরা অন্যের হক মেরে নিজের সিন্দুক ভরতাম? যদি বুঝতাম, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র সুন্নাহর বাইরে প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের জাহান্নামের আগুনের দিকে টেনে নিচ্ছে, তবে কি আমরা এতটুকুও অবহেলা করতাম?
আহল আল-বাইতের সেই মহান ত্যাগ, তাঁদের সবর আর সিদক আমাদের শেখায়—জীবন মানে ভোগ নয়, জীবন মানে বিলিয়ে দেওয়া। 'ইশক-এ-ইলাহি'র নদীতে নিজেকে ডুবিয়ে না দিলে এই নফসের গোলামি থেকে মুক্তি নেই।
হে মহান প্রভু! আমাদের এই পাষাণ হৃদয়ে মারেফতের নূরের এক ফোঁটা বর্ষণ করুন। আমাদের এই দেহ কবরে যাওয়ার আগেই যেন আমাদের অহংকার মৃত হয়ে যায়। মৃত্যুর সেই অনিবার্য শীতলতাকে আলিঙ্গন করার আগে আমাদের রুহ যেন আপনার প্রেমের তাজাল্লিতে আলোকিত হয়ে ওঠে।
ফিরে আসার কোনো পথ নেই। যা আছে, তা কেবল সামনে—এক অনন্ত যাত্রা। সেই যাত্রার পাথেয় কি আমাদের তৈরি আছে?
”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”


আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।